ধান চাষে বিঘায় বাড়লো ৬৬০ টাকা
তেলের দাম বাড়ায় বেড়েছে উৎপাদন খরচ
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৮-১১-২০২৬ ০৩:৩৩:২৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৮-১১-২০২৬ ০৩:৩৩:২৪ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
ডিজেলের দাম বাড়ায় সিরাজগঞ্জে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। জমি প্রস্তুত, সেচ, ফসল কাটা, মাড়াই ও পরিবহন—কৃষির বিভিন্ন পর্যায়ে ডিজেলচালিত যন্ত্রের ব্যবহার থাকায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ছে কৃষকের খরচে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ফসলের দাম একই হারে না বাড়ায় লাভ কমে লোকসানের আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
কৃষকদের হিসাবে, এক বিঘা ধান চাষে শুধু ডিজেলের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৬৬০ টাকা খরচ হচ্ছে। এর সঙ্গে সেচের পানির দাম এবং ডিজেলচালিত হারভেস্টার ও ট্রলিতে ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনের খরচও বাড়ছে। ফলে ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত কৃষকের মোট উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
সিরাজগঞ্জ জেলায় মোট ১ লাখ ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ৫২ হাজার ৭০৮ হেক্টর জমিতে ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জেলার রোপা আমন আবাদি জমির প্রায় ২৭.৪৫ শতাংশ ডিজেলনির্ভর। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব জেলার বড় একটি অংশের আমন আবাদে পড়ছে।
কৃষকদের দেওয়া তথ্যমতে, ধান রোপণ থেকে হারভেস্টিং পর্যন্ত এক বিঘা জমিতে গড়ে ৩৩ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১১৫ টাকা থাকাকালে এতে খরচ হতো প্রায় ৩ হাজার ৮০০ টাকা। দাম বেড়ে ১৩৫ টাকা হওয়ায় একই পরিমাণ ডিজেলের খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৪৬০ টাকা। ফলে বিঘাপ্রতি জ্বালানি খরচ বেড়েছে প্রায় ৬৬০ টাকা।
উল্লাপাড়া উপজেলার তেলকুপি এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম ডিজেলচালিত মেশিন দিয়ে ১০ বিঘা জমিতে সেচ দেন। তিনি বলেন, ‘আগে ১০ বিঘা জমিতে ডিজেলের জন্য প্রায় ৩৮ হাজার টাকা খরচ হতো। এখন একই পরিমাণ জমিতে ডিজেলের জন্য প্রায় ৪৪ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হচ্ছে। শুধু ডিজেলের দাম বাড়ায় আমার অতিরিক্ত প্রায় ৬ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু সে অনুপাতে দাম পাচ্ছি না।’
কৃষক আব্দুর রহমান শেখ বলেন, তেলের দাম বাড়ায় সেচ পাম্পের মালিকেরা পানির দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া ডিজেলচালিত হারভেস্টার ও ট্রলিতে ধান কাটা, মাড়াই ও বাড়িতে নেওয়ার খরচও বাড়বে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে।
উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এক মণ ধান রোপণ থেকে শুরু করে ঘরে তোলা পর্যন্ত কৃষকের প্রায় ৮০০ টাকা খরচ হয়। তবে কৃষকদের হিসাবে এ খরচ ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। আবহাওয়া খারাপ হলে তা আরও কয়েকশ টাকা বেড়ে যায়।
রায়গঞ্জ উপজেলার হাটপাঙ্গাসী গ্রামের কৃষক সুজাবত আলী বলেন, ‘ধানের উৎপাদন খরচ যেভাবে বাড়ছে, তাতে এবার চাষ করে লোকসান হবে। কারণ এক মণ ধান ঘরে তুলতে ১ হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। অথচ মৌসুমে ধানের সর্বোচ্চ বাজারদরও ১ হাজার টাকা। ফলে উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের দাম কম থাকায় কৃষকের লোকসান হচ্ছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় এই লোকসান আরও বাড়বে।’
আরেক কৃষক তাজিমুদ্দিন বলেন, ‘এবার আমন চাষে সব মিলিয়ে খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর মধ্যে সার ও সেচের খরচ বেড়েছে। এখন ডিজেলের দাম বাড়ায় ধান কাটা ও মাড়াইয়ের খরচও বাড়বে। আমনেই যদি এত খরচ হয়, তাহলে বোরোতে কী হবে, সেটা ভাবতেই ভয় লাগে। শুধু খেয়ে বেঁচে থাকার জন্যই আবাদ করছি।’
ধান ছাড়াও সিরাজগঞ্জে সবজি, ভুট্টা, সরিষা ও গমসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে জ্বালানি ব্যবহারের কারণে কৃষকের ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ও কৃষিযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ফসলগুলোর উৎপাদন খরচে এর প্রভাব পড়ছে।
নভেম্বরের শেষ দিকে শুরু হবে বোরো ধানের বীজতলা তৈরির কাজ। এরপর জমি প্রস্তুত থেকে ধান কাটা পর্যন্ত প্রায় পুরো মৌসুমেই সেচের প্রয়োজন হবে। ফলে বোরো মৌসুমেও ডিজেলের বাড়তি দামের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মনজুর এ মওলা বলেন, ‘তেলের দাম বৃদ্ধিতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এটি অস্বীকারের সুযোগ নেই। সরকার সব বিষয় বিবেচনা করে ধানের দাম বাড়ালে কৃষকেরা কিছুটা লাভবান হতে পারবেন।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স